বাংলার রাজনীতির রাজপথ যাঁর স্লোগান ও পদচারণায় একসময় প্রকম্পিত হতো, তিনি সাইফুল আলম নীরব। ছাত্রদল থেকে শুরু করে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক—প্রতিটি ধাপেই তিনি ছিলেন রাজপথের অতন্দ্র প্রহরী। শত শত রাজনৈতিক মামলা আর কারাবরণ যাঁর ললাটে সাহসিকতার তিলক এঁকে দিয়েছিল, আজ তিনি এক বিচিত্র পরিস্থিতির মুখোমুখি। দীর্ঘ লড়াই শেষে বিএনপি আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়, প্রিয় নেতা তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী; অথচ এই সুসময়ে সাইফুল আলম নীরব দলের কাঠামোর বাইরে, সাময়িক বহিষ্কৃত। ঢাকা-১২ আসনে জোটের রাজনীতির জটিল সমীকরণে প্রার্থী হয়েও হোঁচট খেয়েছেন। তবুও তাঁর হৃদস্পন্দনে আজও কেবলই বিএনপি। ক্ষমতার বলয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এই তুখোড় নেতার মনের না বলা কথা ও দলের প্রতি অবিচল আনুগত্যের গল্প শুনতেই আজ আমরা মুখোমুখি হয়েছি তাঁর।
নোটো পোষ্ট: ৪৪ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে আপনি ছাত্রদল ও যুবদলের সর্বোচ্চ পদে ছিলেন। আজ দল ক্ষমতায়, অথচ আপনি বাইরে—এই মুহূর্তের অনুভূতিটা কেমন?
সাইফুল আলম নীরব: দেখুন, আমার রাজনৈতিক জীবনের ৪৪ বছরে এই প্রথম দল থেকে বহিষ্কারের দুঃসহ বেদনা সইতে হচ্ছে। এর আগে পদ ছিল না—এমন সময় গেছে, কিন্তু দলের পরিচয়টুকু কেড়ে নেওয়া হয়নি। এটি আমার জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তবে পদ-পদবি বড় কথা নয়, আমার ধমনীতে শহীদ জিয়ার আদর্শ। দল ক্ষমতায় আসায় আমি তৃপ্ত, কিন্তু এই সাফল্যের দিনে পরিবারের বাইরে থাকাটা কষ্টের।
নোটো পোষ্ট: ঢাকা-১২ আসনে দল থেকে আপনাকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দিলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত কি আপনি মেনে নিতে পারেননি?
সাইফুল আলম নীরব: ২০১৮ সালেও আমি এই আসনে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে লড়েছি। এবারও দল আমাকেই যোগ্য মনে করেছিল। কিন্তু একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী, যারা গত ১৬ বছর স্বৈরাচারের সাথে আপস করে চলেছিল, তারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। আমি মূলত ঢাকা-১২ আসনে ধানের শীষের ভোটারদের অস্তিত্ব রক্ষা করতেই লড়েছি। চেয়েছি এই এলাকা যেন জিয়া পরিবারের সমর্থকদের হাতছাড়া না হয়।
নোটো পোষ্ট: স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিল?
সাইফুল আলম নীরব: আমি মনে করি আমার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না। আমি কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতার মোহ থেকে নয়, বরং বিএনপির আদর্শকে টিকিয়ে রাখার জন্যই ফুটবল মার্কায় লড়াই করেছি। একটি পক্ষ ধানের শীষকে এক প্রকার বিক্রি করে দিয়ে অন্যকে জেতানোর চেষ্টা করেছিল, আমি চেয়েছি সত্যিকারের কর্মীরা যেন তাদের নেতৃত্বের ওপর আস্থা না হারায়।
নোটো পোষ্ট: ভোটের ফলাফলে কি জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে?
সাইফুল আলম নীরব: আমি সবসময়ই বলেছি আমি শহীদ জিয়ার সৈনিক, তারেক রহমানের একজন বিশ্বস্ত কর্মী। ঢাকা-১২ আসনে যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন, তারা সাচ্চা জিয়ার সৈনিক। তারা জানেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন থেকে হাসিনার ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই—আমি সবসময় তাদের ঢাল হয়ে ছিলাম। এই এলাকার ভোটাররা আমার দীর্ঘ ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন।
নোটো পোষ্ট: পরাজয়ের প্রধান কারণ কী বলে মনে করেন?
সাইফুল আলম নীরব: সারা বাংলাদেশে ভোট পড়ার হার বেশি থাকলেও ঢাকা-১২ আসনে ছিল মাত্র ৩৬%। এর মানে বড় একটি অংশ কেন্দ্রে আসেনি। অনেকে ধানের শীষ না পেয়ে অভিমানে ভোট দেয়নি। যদি স্বাভাবিক পরিবেশ থাকত, তবে ইনশাআল্লাহ ফলাফল অন্যরকম হতো।
নোটো পোষ্ট: আপনার মতো ত্যাগী নেতার বিরুদ্ধে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কি একটু বেশি কঠোর হয়ে গেল না?
সাইফুল আলম নীরব: রাজনৈতিক পরিক্রমায় বহিষ্কার হওয়াটা অত্যন্ত কষ্টের। আমি মাঠের কর্মী। বহিষ্কারের পরদিনও বলেছি, আমি তারেক রহমানের নেতৃত্বেই থাকব। প্রতিটি গণসংযোগে আমি শহীদ জিয়ার আদর্শ প্রচার করেছি। আমার বিশ্বাস, হাইকমান্ড আমার দীর্ঘদিনের শ্রম ও ত্যাগের বিষয়টি সদয়ভাবে বিবেচনা করবে।
নোটো পোষ্ট: বহিষ্কৃত হওয়ার পর দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে কোনো যোগাযোগ হয়েছে?
সাইফুল আলম নীরব: নির্বাচনের পর প্রতিটি ওয়ার্ডে আমি ইফতার মাহফিল করেছি। সেখানে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাফল্য কামনায় দোয়া করা হয়েছে। আমি একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে আমৃত্যু তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করে যেতে চাই।
নোটো পোষ্ট: তারেক রহমান এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। আজ আপনার এই অবস্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সাইফুল আলম নীরব: ৪৪ বছর এই এলাকার মানুষের সাথে আমার আত্মার বন্ধন। যারা গত ১৬ বছর স্বৈরাচারের সাথে আঁতাত করে আরাম-আয়েশ করেছেন, তারা আমার বেদনা বুঝবেন না। তবে আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষকে যে স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, আমি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একজন সামান্য সিপাহী হতে চাই।
নোটো পোষ্ট: আপনি কি পুনরায় বিএনপিতে ফেরার জন্য আবেদন করেছেন?
সাইফুল আলম নীরব: আমি প্রতিটি মুহূর্তেই নিজেকে বিএনপির কর্মী মনে করি। দলের হাইকমান্ডের প্রতি আমার আকুল আবেদন—আমার দীর্ঘ ৪৪ বছরের ত্যাগ ও শ্রমের মূল্যায়ন করে এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হোক। এই যন্ত্রণা আমার জন্য অসহনীয়। আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারেক রহমানের নেতৃত্বে কাজ করতে চাই। আমাকে আবারও ‘বিএনপি কর্মী’ হিসেবে বুক ফুলিয়ে চলার সুযোগ দেওয়া হোক।
নোটো পোষ্ট: পাঠকও নেতা কর্মীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
সাইফুল আলম নীরব: আসুন, আমরা সবাই মিলে ঢাকা-১২ আসনকে সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলি। শহীদ জিয়ার আদর্শ বুকে নিয়ে আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।
দীর্ঘ আলাপচারিতায় সাইফুল আলম নীরবের কণ্ঠে বারবার ঝরে পড়েছে রাজপথের লড়াকু স্মৃতি আর দলের প্রতি এক গভীর, অবিচল ভালোবাসা। ক্ষমতার কেন্দ্রে আজ তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধারা থাকলেও, তিনি আজ প্রান্তিক এক দর্শক হয়ে কেবলই দলের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। তবে পরাজয় কিংবা বহিষ্কার—কোনোটিই তাঁর রাজনৈতিক সত্তাকে ম্লান করতে পারেনি। ৪৪ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই নিবেদিতপ্রাণ নেতা আবারও চেনা আঙিনায় ফিরবেন এবং তাঁর ওপর থেকে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে দল তাঁকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করবে—এমনটিই এখন তাঁর হাজারো ভক্ত ও কর্মীর প্রাণের দাবি।

